চাকরি করি তাই কম পয়সায় ছবি তুলতে পারি।

একটা প্রশ্ন প্রায়ই মগজে জট পাকায়। মানুষ আসলে কখন বড় হয়। দিনের বেলা খেতে খেতে না রাতের বেলায় ঘুমুতে ঘুমুতে। নাকি মগবাজার থেকে মিরপুর লোকাল বাসে ঝুলতে ঝুলতে বড় হয়। এটুকো লিখতে লিখতেও খানিকটা বড় হয়ে গেছি। প্রতি মুহুর্তেই হচ্ছি। বড় হওয়া মানে বুড়ো হওয়া নয়। বড় হওয়া মানে “বোধের” বিকাশ সাধন। আর “শিক্ষা” হলো এই “বোধের” বিকাশের একমাত্র সহায়ক মানবিক কর্মবৃত্তি। এই শিক্ষা যে সব সময় ক্লাশ রুমের মোটা ফ্রেমের চশমাওয়ালা স্যারের মুখ নি:সৃত হবে হবে এমন কোন কথা নেই এই শিক্ষা বাড়ীর সামনের পঙ্গু ভিক্ষুকটার কাছ থেকেও আসতে পারে। যে কিনা প্রতিদিন সকালে হাসি মুখে বলে জ্বী স্যার আলহামদুল্লিাহ ভালো আছি্। দুটি পায়ের অভাবও তার ভালো থাকার স্পৃহাকে দমাতে পারেনি। এটাই বা কম শেখার কি !!

আমরা যারা “নাড়ির” মায়া ত্যাগ করে বিদেশ বিভুইয়ে এসে রুটি রুজির চিন্তায় দিন রাত এক করে ফেলছি আমাদের শেখার পরিধি আরো ব্যাপক। অনেকের মাঝে একটু “জায়গা” করে নেয়ার প্রতিদিনকার যুদ্ধের জয় পরাজয় মুখ্য হয় না মুখ্য হয়ে দাড়ায় কতটুকো শিখলাম তাই। এভাবে যত শিখি তত বড় হই। একটা শ্যাওলা পড়া সঙ্গীন স্টুডিওতে পাসপোর্ট সাইজের ছবি তোলা থেকে আজকের অনাড়াম্বর ফটোশুট এর মাঝে আসার সময় টাতে সবথেকে বেশী শিখেছি। বড় হয়েছি।

আজকাল অনেক ফটোগ্রাফারকে দেখি যারা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে সফল। প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেক্ট্রেক মিডিয়াতে তাদের তোলা ছবি হরদম বিকিকিনি হয়। এবং তারা সেখানে সেলিব্রেটিও বটে। ব্যাক্তিগত ভাবে জানি এরা মানুষ হিসাবে যথেষ্ট ভালো আর কর্মী হিসাবেতো বটেই। প্রত্যেকটা পেশারই একটা নির্দিষ্ট ট্রাক আছে। আর কর্মী হিসাবে প্রত্যেকেরই নিজস্ব মিশন আছে ভিসন আছে আছে নির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি। এই ধরুন ফটোসাংবাদিকরা “বিট” কাভার করে আর আমরা ফটোগ্রাফাররা “ইভেন্ট” কাভার করি অথবা “পণ্য” বা ফ্যাশন হাউজের জন্য কাজ করি। তেলে জলে মিলে একই তবে কর্মপদ্ধতিটা ভিন্ন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে আজকাল অনেক ফটোসাংবাদিকরাই তাদের নিজেদের দক্ষতা ভুলে “রাষ্ট্রের” ছবি বাদ দিয়ে বর কনের ছবি, পণ্যর ছবি তুলে বেড়াচ্ছে। তাদের ভাষ্য, চাকুরীর পাশাপাশি একটু বাহিরে সময় দেই সামান্য কম টাকায় কাজ করলে সমস্যা কি? অপেক্ষাকৃত অল্প খরচে এ কাজে বর কনে বা ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের কি লাভ হয় জানি না তবে সেই ফটোসাংবাদিক আর দেশের যে খানিকটা ক্ষতি হয় তা বুঝি। ঐ অভিজ্ঞ চোখ দুটো যখন ফ্রেম আর পুরো দেশটাই যাদের সাবজেক্ট,ক মিউনিটি সেন্টারের ছোট্ট করিডারে তাদের আকা বাকা হয়ে দাড়িয়ে পড়াটা ঠিক যায় না বা স্টুডিয়ো তে লাইটেং এর মাঝেও  বেধে রাখা যায় না। ওটা আমাদের কাজ। আমরা মুহুর্ত শুধু ধরে রাখি না সুন্দর রঙ্গে রাঙ্গিয়ে দেই। আমরা একটি পণ্যকে করি জীবন্ত।

একটা সময় ফটোগ্রাফার এর হাতের মাঝে থাকতো ফ্যাশন হাউজের ডিজাইনার বা হাউজের মালিক। এখন আপনাদের মত গুনি চাকুরীজীবী দের জন্য বিষয়টা উল্টো। সামান্য গিফট বা নাম মাত্র মূল্যে অনেক সময় মডেল দের সাথে সেলফি বা পোর্টফোলিও এর লোভে ফ্যাশন ডিজাইনাররা ইচ্ছে মত ফটোগ্রাফার দের হাতের মুঠোয় রেখেছে। নাম ধারি নতুন ডিএসএলআর ব্যবহারকারী দের কথা তো বাদই দিলাম। আমি জানি অনেক ক্ষেত্রে এগুলো হয় স্রেফ অনুরোধের ঢেকি গেলা। তবে সত্যি কথা কি আপনি অনুরোধের ঢেকি গিললেন আর আমার বদ হজম হলো। জি আমরা মাস শেষে আপনাদের মত বেতন পাই না আমাদের এই কাজ করেই চাহিদা পুরন করতে হয়। মুহুর্তকে ফ্রেমে বন্দী করে পরিবারের জন্য অবারিত করি সুখ, সাচ্ছন্দ।

শেষে একটা গল্প বলি :

এক বাবা একটা ইদুরের লেজে দড়ি বেধে তার একটা প্রান্ত ছেলের হাতে তুলে দেয়। ছেলেটি খেলার ছলে হাতে সুতা রেখে ইদুরটিকে ছেড়ে দেয়। আর ইদুরটি হুট করে মুক্তি পেয়ে দৌড়ে পালিয়ে অনেক দুর চলে যায়। তারপর বাচ্চাটি্ একসময় দড়ি ধরে টান দেয়। শক্ত কংক্রিটের আঘাতে বুক পেট রক্তাত্ব করে ইদুর বাচ্চাটার কাছে ফিরে আসে।আবার সুতা ছেড়ে দেয়।আবার ইদুর দৌড়ে পালায়। আবার সুতায় টান পড়ে। আবার ফিরে আসে। এভাবে চলতেই থাকে। বাচ্চাটির জন্য এটা স্রেফ একটা খেলা কিন্তু ইদুরটার জন্য মোটেই নয়। এটা তার জন্য জীবন সংহারী। প্রথমে শুরু করেছিলাম বড় কখন হই তা দিয়ে। আশা করি এই পাচ মিনিটে একটু হলেও বড় হয়েছেন। ভালো থাকবেন ।

 

আবু সুফিয়ান নিলাভ

ফটোগ্রাফার।

Comments

comments