শুধু ফটোগ্রাফার/সিনেমাটোগ্রাফার নয়, প্রফেশনাল ও অভিজ্ঞ ফটোগ্রাফার/সিনেমাটোগ্রাফার কেন জরুরী।

পুনরায় ফিরে আসলাম আমার দ্বিতীয় লিখা নিয়ে। কি ভাবলেন আমার প্রথম লেখাটা পড়ে? ফটোগ্রাফার খুব জরুরী তাই না? কিন্তু বাসায় ছোট ভাইয়েরই তো দামী ক্যামেরা আছে। বন্ধুদের মাঝেও কয়েকজন বেশ ভালো ছবি তোলে। তারা থাকতে কেন এই টাকা দিয়ে ফটোগ্রাফার হায়্যার করবো? হ্যাঁ আপনার যুক্তি এক অর্থে সঠিক। কাছের মানুষদের দামী ক্যামেরা থাকতে কেন ফটোগ্রাফার কে দিয়ে কাজ করাবেন? এবার আসুন তা জেনে নেই শুধু ফটোগ্রাফার নয় কেন প্রফেশনাল ও অভিজ্ঞ ফটোগ্রাফার জরুরী।

মধু খেতে ব্যর্থ হয়ে মৌচাকের দোষ দিয়ে লাভ নেই। ভাবছেন বিয়ে শাদীর মধ্যে মৌমাছি মৌচাক কোথা থেকে এলো। আসুন একটু ঝেড়ে কাশি !!

একজন ব্যাটসম্যান যখন ক্রিজে আসে তখন তাকে মাঠের পিচ, আবহাওয়া, আউটফিল্ড সবকিছু নিয়ে ভাবতে হয়। ক্রিজে বল ফুল লেন্থের হতে পারে, হাফ ভলি হতে পারে, ইয়ার্কার হতে পারে, শর্ট বল হতে পারে এমনকি এ্যাবনরমাল বাউন্সও হতে পারে। একজন পুর্নাঙ্গ ব্যাটসম্যানকে এই সব কিছু ভাবতে হয়। একটা স্ট্যাটেজি নিতে হয়। ব্যাটসম্যান হয়তো সুইফট শর্টে ওস্তাদ তাই বলে বিপক্ষ দলের সব বল লেগ সাইডে আলু হয়ে পড়বে এই আশা করাটা অন্যায়। মোদ্দা কথা একজন ব্যাটসম্যানকে খেলা সম্পর্কে, খেলার নিয়ম সম্পর্কে সম্যক ধারনা থাকা জরুরী। নয়ত এক গাদা প্রতিভা নিয়েও আশরাফুলের মতো ক্রিকেটের নকল খেলোয়ার হয়ে থাকতে হবে। তাই ক্রিজে আসা মাত্র প্যাভিলিয়েনে ফিরতি যাত্রা ধরতে যেমন ক্রিজের দোষ দিয়ে লাভ নেই তেমনি মধু খেতে না পারার ব্যর্থতা ঢাকতে মৌচাকের দোষ দিয়েও লাভ নেই।

এবার মৌমাছিটাকে বিয়ে বাড়ীতে নিয়ে আসি। এদেশে সময়ের ট্রেনই সময় মেনে আসে না আর বিয়ে বাড়ী মহাযজ্ঞ যে সময়ের নিয়ম মাফিক অনুষ্ঠিত হবে সেটা আশা করা যায়, তবে দাবী করা যায় না। স্টেজে বউয়ের আসার কথা আটটায়। বিউটি পার্লারের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে বউ যখন স্টেজে পা দিলো তখন তখন ঘড়ির কাটা দশটা ছুঁই ছুঁই। আপনি যখন বিলম্বিত বাসরে বিরক্তির চুড়ান্তে ফটোগ্রাফারের প্রাথমিক পরিকল্পনার পরী ততক্ষনে উড়ে গেছে আর কেবল কল্পনাটুকুই আছে। আগেই বলেছি ফটোগ্রাফার কেবল ছবি তুলে না মুহুর্তটাকে বন্ধী রাখে। সেক্ষেত্রে তাকে স্থান-কাল-সময়-আলো সবকিছু নিয়ে ভাবতে হয়। সময় নিয়ে আপনার গন্ডগোল চুড়ান্ত হলেও দিন শেষে আপনি কিন্তু ফটোগ্রাফারের কাছ থেকে তার সেরাটাই চাইবেন। তাই এসব পরিস্থিতি সম্পর্কেও একজন প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারের সম্যক ধারনা থাকে যার একজন সৌখিন ক্যামেরাধারীর থাকেনা। একজন প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার ইভেন্টে ছবি তোলার মতো পর্যাপ্ত সময়, আলোর উপস্থিতি এবং সুযোগসহ আনুষঙ্গিক বিষয় মাথায় রেখে খুব দ্রুত প্রতিকূল পরিস্থিতিকে তার অনুকূলে নিয়ে আসেন।

তো বুঝতেই পারছেন কেন আপনি বিয়েতে প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার রাখবেন। এর পরেও আরও কি কি বিষয় জরুরী তা আলোচনা করছি। আসুন দেখে নেই, শুধু ফটোগ্রাফার/সিনেমাটোগ্রাফার নয়, প্রফেশনাল ও অভিজ্ঞ ফটোগ্রাফার/সিনেমাটোগ্রাফার কেন জরুরী।

  • একটি প্রফেশনাল টিম বুঝে আপনার মূল্যবান এই দিনের গুরুত্ব। তাই সে সর্বপ্রথমে তার কাজ নিয়ে গবেষণা করে। এই গবেষণার সুবাদে একজন ফটোগ্রাফার/সিনেমাটগ্রাফার একাধিক বার ক্লায়েন্ট এর সাথে মিটিং করে। তার রুচি, পছন্দ, চাহিদা, ভালোলাগা, মন্দলাগা, পরিবারের অন্যান্য দের দৃষ্টিভঙ্গি, আপনার লাইফ স্টাইল, অনুষ্ঠানের সময় ও বিস্তারিত সবই যে আগে থেকে পরিকল্পনা করে।
  • একটি প্রফেশনাল টিম অবশ্যই কাজের আগেই কন্ট্রাক হবার সময় কন্ট্রাক পেপার করে নেয় ক্লায়েন্ট এর সাথে। সেখানে ওই কাজ সংশ্লিষ্ট সকল বিষয় স্পষ্ট উল্লেখ থাকে। তাই দুই দিক থেকেই সবাই নিজস্ব জায়গায় অবস্থান পরিষ্কার থাকে।
  • প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার/সিনেমাটগ্রাফার বুঝে যে একটা বিয়েতে কি কি বিষয় গুলো গুরুত্বপূর্ণ। তাই সে পর্যায়ক্রমে তার পূর্ববর্তী পরিকল্পনা অনুযায়ী সব মুহূর্ত ক্যামেরা বন্ধী করে। 
  • কোন কারনে পূর্ববর্তী পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু না ঘটলে সে তাৎক্ষনিক ভাবে বিচলিত না হয়ে অভিজ্ঞতা কে কাজে লাগায়। এক্ষেত্রে এটা প্রফেশনাল দের প্লান বি বলতে পারেন। কারন তারা সম্ভাব্য সকল পরিস্থিতি চিন্তা করে প্লান এ প্লান বি করে নেন।
  • প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার/সিনেমাটগ্রাফার বুঝে আপনার সামাজিক অবস্থা। তাই কখন কোথায়, কিভাবে, কোনটা করতে হবে তা সে খুব ভালো ভাবে জানে।
  • আপনার অনুষ্ঠানে সকল মেহমান আপনার কাছে অনেক সন্মানিয়। আপনি যেভাবে তাকে মূল্যায়ন করছেন একজন প্রফেশনাল ও জানে তাদের কিভাবে সম্বোধন করতে হবে। মেহমানরা মোবাইলে ছবি তুলবেই, হুট করে ফটোগ্রাফারের সামনে চলে আসবে, যে কোন রকম অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত তৈরি করতেই পারে। এই পরিস্থিতি গুলো কি যে কেউ আপনার মত করে মোকাবেলা করতে পারবে?
  • এটা আপনার জীবনের প্রথম এবং একমাত্র বিয়ে হবার কারনে বিয়ের অনেক কিছুই আপনি একভাবে ভাবলেও সেটা সেই ভাবে হবে না। একজন অভিজ্ঞ প্রফেশনাল তার জীবনে ১০০-৫০০ এর বেশি বিয়ের অনুষ্ঠানে কাজ করেছে। সুতরাং সে জানে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা, রীতিনীতি, বিয়ের সকল ধারাবাহিক নিয়ম এবং সকল কাঙ্ক্ষিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় গুলো।
  • ক্লায়েন্ট ভেনুতে তার নির্দিষ্ট সময়ে আসলেও একজন প্রফেশনাল অনেক নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ভেনুতে এসে ভেনুর অবস্থা বুঝে নেয়, কি ধরনের কাজ কোথায় কিভাবে করবে তা নিয়ে একটু প্র্যাকটিস করে নেয় এবং ডেকরের ছবি ভিডিও নেওয়া সহ আনুসাঙ্গিক সকল কাজ শেষ করে নেয়।
  • একজন প্রফেশনাল তার কাজের সময় ওই অনুষ্ঠানের উপযোগী পোশাক নিজেও পরিধান করে এবং অনুষ্ঠান চলাকালীন ধূমপান, ফেসবুকিং, ফোনে কথা বলা সহ ব্যক্তিগত সকল বদভ্যাস গুলোকে এড়িয়ে চলে।
  • একজন প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার/সিনেমাটগ্রাফার জানে যে সে আপনার অনুষ্ঠানে দাওয়াতি মেহমান না সুতরাং তার কাজের সময় কতটুকু, তার কি কি দায়িত্ব সব কিছু সম্পর্কে তারা খুব ভালো ধারনা রাখে।
  • একটি অনুষ্ঠানে স্বাভাবিক ভাবেই অনেক সময় একাধিক টিম কাজ করে। সুতরাং প্রফেশনাল টিম সর্বদা প্রস্তুত থাকে বিপরীত টিমের সাথে অবশ্যই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রেখে কাজ করার। তারা খুব ভালো করে জানে তাদের দায়িত্ব কিভাবে তারা প্রতিবন্ধকতার মাঝে পালন করবে। একজন প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার/সিনেমাটগ্রাফার নিজেকে কখনই পাড়ার গুণ্ডা নিজেকে ভাবে না। সে একজন আর্টিস্ট। 
  • কাজের জন্য কটটুকু মেমোরি কার্ডে জায়গা লাগবে, কতগুলো ব্যাটারি লাগবে সব কিছুর ধারনা প্রফেশনালের থাকে। তাই তারা সর্বদা ব্যাকআপ রেখেই কাজ করে।
  • অনেকেরই জীবনে বাজে অভিজ্ঞতা আছে ছবি ভিডিও হারাবার। আপনার কাজের শেষে ওই অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ সকল ছবি ভিডিও কিভাবে সংরক্ষণ করতে হবে তা একজন প্রফেশনাল জানে।
  • ছবি ভিডিও নির্দিষ্ট সময়ের মাঝে কিভাবে কোয়ালিটি ঠিক রেখে ডেলিভারি দিতে হবে তাও একটি প্রফেশনাল টিম ভালোভাবে জানে। এছাড়া অনেক সময় গুরুত্ব বুঝে আর্জেন্ট কাজ তুলতে হয় তাই তাদের প্রয়োজনের অধিক কর্মীও নিয়োগ থাকে।
  • আপনার অনুষ্ঠানের ছবি আপনার এবং আর্টিস্ট দুইজনের কপিরাইট থাকলেও এতোটুকু একজন প্রফেশনাল জানে যে কখন কোথায় কিভাবে আপনার কোন ছবি শেয়ার করতে পারবে আর কোনটা শেয়ার করতে পারবে না।
  • একটি প্রফেশনাল টিম কোন ভাবেই বিনাকারনে তাদের কমিটমেন্ট ভাঙবে না। এবং সে তার পূর্ববর্তী কন্ট্রাক পেপার অনুযায়ী সকল কাজ শেষ করবে।

এভাবে লিখতে থাকলে অনেক দূর যেতে থাকবে তবে পরিশেষে আরেকটা ছোট গল্প বলে শেষ করি। এটা আমার এক বড় ভাইয়ের কাছে শোনা। বেচারা আফসোস করে একদিন বলছেন আমাকে তার নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া এই গল্প। তার বিয়ের সময় উনি কম দামে স্টুডিও থেকে ১ জন ভিডিওগ্রাফার এনেছিলেন কিন্তু কোন ফটোগ্রাফার আনেননি। উনি ভেবেছিলেন বাসায় ২/৩ টা কাজিনের ডিএসএলআর আছে আর বন্ধুবান্ধবের মাঝে ভালো ছবি তোলে এমন কয়েকজন তো আছেই। বিয়েতে সবাই আসবে তাই শুধু শুধু পয়সা খরচ করে ফটোগ্রাফার রাখার দরকারটা কি? বিয়ের দিন তাই হলো। কাজিন ও বন্ধুবান্ধব মিলে ৪-৫ টা ক্যামেরা ছিলো । সবাই ছবি তুলেছে অনেক ভাবেই। বিয়ের কিছুদিন পরে সবার কাছে ছবি নিলেনন তিনি। ছবি দেখে যারপরনাই হতাশ। এক কথায় তিনি আমাকে যা বললেন, তা হচ্ছে, “ভাই মনে হল অন্য কারো বিয়েতে আমি আর তোমার ভাবী বর বউ সেজে দাওয়াত খেতে গিয়েছি। সব তাদের ছবি আর এর মাঝে নিজেদের কিছু ছবি পেয়েছি। আর যেই ছবিগুলো পেয়েছি তা আসলে অ্যালবামে বা ফেসবুকে শেয়ার করার মত ছবি না। তাই কম দামের হলেও সেই ভিডিও দেখেই আজও দুধের সাধ ঘোলে মিটাই। আগে বুঝলে সত্যি শপিংয়ে একটু টাকা কম খরচ করে হলেও এদিকে একটু বেশি খরচ করতাম।”

উনার আফসোস এর গল্প পড়ে কিছুটা কি বোধদয় হয়েছে প্রিয় পাঠক, কেন প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার এর প্রয়োজন আপনার জীবনের সবচেয়ে কাংখিত এবং সবচেয়ে স্পেশাল দিনটির জন্য? মুহূর্তগুলোকে আটকে রাখবেন নাকি দিনশেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন চুপিসারে? পছন্দ একান্তই আপনার ?

এই সিরিজের প্রথম লিখটা পাবেন এই লিংক এ।

 

সকল প্রকার মন্তব্য ও সমালোচনা গ্রহণযোগ্য। এই পোষ্টের নিচে কমেন্ট করার অপশন আছে। আপনার মন্তব্য কমেন্টে জানান।

আমাদের সাথেই থাকুন। লিখাটা অনেক অনেক শেয়ার দিন। সম্ভব হলে লেখকের ক্রেডিট দিবেন যাতে আরও ভালো কিছু লিখার অনুপ্রেরণা পাই। কষ্ট করে লিখাটা পরার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।

আবু সুফিয়ান নিলাভ 

প্রধান আলোকচিত্রী, নিজলক্রিয়েটিভ ফটোগ্রাফি

ফেসবুকে আমাকে ফলো করতে এই লিংকে ক্লিক করুন।

Comments

comments