নীল জীবনের গল্প

আমরা প্রত্যেকেই একটা করে মধুর ছেলেবেলার স্রষ্টা। সময় নামের পাগলা ঘোড়াটা দিন দিন যতই গন্তব্যের ইতি রেখায় এগিয়ে যায়, ফেলা আসা ছেলেবেলাটা ততই মধুর থেকে মধুরতর বলে দৃশ্যমান হয়। “মেয়েবেলা” বলতে কেবল তসলিমা নাসরিনের একারই। বাকী নারী পুরুষ আমরা সবাই নির্বিবাদে সেই ছেলেবেলায় বড্ড ছেলেমানুষী করেই পার করেছি। ছোটবেলায় সবারই হুট করে “বড়” হবার একটা কামনা থাকে। সে নির্দোষ কিন্তু অযাচিত কামনার বাস্তবায়নে কতই না আম গাছে ঝোলান লোহার রিংয়ে ঝুলে ঝুলে হাত ব্যাথা করেছি আর কতই না লুকিয়ে লুকিয়ে নতুন সদ্য জন্ম নেয়া গোফের কৈশর সৃতিতে ক্ষুর চালিয়েছি তার ইয়াত্তা নেই। আর এখন না চাইলেও বড় হওয়াটা থেমে থাকে না। বয়সের রেখায় চামড়ার ভাজ পড়ে সৃতিতেও পরে। মানব জীবন নিয়ে সময়ের এ এক অদ্ভুত মায়ার খেলা। যে খেলাতে আমরা সর্বদাই হেরে যাই,তারপরেও খেলতে হয়।

একটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো মানুষ ভুত বিশ্বাস করে না অথচ ভয় পেতে ভালোবাসে। ভুত নেই ভুত নেই বলে রাজ্যের যুক্তি তর্কের অবতারনা শেষে ঘুমের সময় ঠিকই শিয়রের কাছে রসুন আর লোহা রেখে ঘুমায়। পাছে ভুতে চেপে ধরে এই আশংকায়। আসলে অলৌকিকতায় আস্থা রাখা মানুষের একটা সহজাত প্রবৃত্তি। এতে সব থেকে বেশী যে মানসিক শান্তি পাওয়া যায় তা হলো যে কোন অক্ষমতার দায় সৃষ্টিকর্তার উপর চাপিয়ে নিশ্চিতে বসে থাকা যায় “সব কপালের দোষ” বলে।

ছোটবেলায় বাসায় সাপুরে এলে খুব আগ্রহ নিয়ে ওদের মিথ্যা গুলোকে দেখতাম। বিশ্বাস করতাম সাপুড়ের বীনে পাগল হয়ে সাপ এভাবে নাচে। তারপর বয়স বাড়লো,চশমার কাচের পাওয়ারও বাড়ল। কানের পাশ দিয়ে দুই চারটা কালো চুল ফ্যাকাশে হয়ে বার্ধক্যও উকি দিতে শুরু করলো। বুঝতে শিখলাম সাপুরের ওগুলো সবই মিথ্যা বাহানা। পেট পুজোর প্রসাদমাত্র। সাপুড়ের দলের মিথ্যের বেসাতী এখনও মাঝে মাঝে চোখে পড়ে। বেখেয়ালে হয়তো দু একবার তাকাইও। তবে ছেলেবেলার অল্পতেই মুগ্ধ হওয়ার সেই চোখ দুটো হারিয়ে ফেলেছি বলে এখন আর মুগ্ধ হইনা। চোখেরও বয়স হয়েছে।তবে আমি নেই বলে ওদের দর্শকের ভাটা পড়নি। অজস্র ছেলেবেলার নিলাভ গোল হয়ে বসে মুগ্ধ চোখে সাপুরের ঝোলা দেখে,সাপ দেখে। আর আমি এখন ওদের জীবন দেখি। সময় এমনই।কিছুই বদলায় না শুধু দেখার চোখ বদলায় ভাবার মন বদলায় ।

এই ঢাকা শহরে যেদিন প্রথম পা রাখি বুকের একপাশে ছিল আকাশ ছোয়ার স্পর্ধা আর অন্যপাশে ছিল চীরতরে হারিয়ে যাবার শংকা। আমার ঝিঝি পোকা দেখা চোখ,লাল নীল বাতিতে অস্বস্তি লাগে। চারপাশে যা দেখি সবই নতুন।সেবারই আমার অনেক কিছুই “প্রথম” হলো। প্রথম বাড়ী ছাড়া,প্রথম এত এত মানুষ দেখা, সেই প্রথম অনেকের মাঝে থেকে একা হয়ে যাওয়া। আমার নাবালোক চোখে তখন রাজ্যের বিষ্ময়। মাথা তুলে তাকালে গায়ে ক্ষেতের তকমা লাগবে বলে আড় চোখে যে কত বিল্ডিং এর তলা গুনেছি তার ইয়াত্তা নেই। গুলিস্তানে ক্যানভাসারা ছিল ছিল আমার অন্যতম দর্শনীয় চরিত্র। আজকালকার আরজে দের মতোই ছিল তাদের হরবর করে শেখানো বুলি আওড়ানো। এক দমে ছন্দ মিলিয়ে  কতো অনায়াসেই যে তারা সর্বরোগের ঔষধ মিলিয়ে দিতো তা এক অলৌকিক যোগ্যতা বটে।মন দিয়ে তাদের পসরা সাজানো দেখতাম। ভালো লাগতো খুব।কখনও ভোক্তা হইনি।মনযোগী শ্রোতা হয়েই ছিলাম। বোধ হয় একটু একটু বিশ্বাসও করতাম যে অর্জুন গাছের ছাল ধুয়ে তিন বেলা পানি খেলে পুরো ক্যানসার না হোক অন্তত অর্ধেক ক্যান্সার তো ভালো হতেই পারে। হতদরিদ্র,ছেড়া জামার চোয়ালভাঙ্গা মানুষ গুলোকে দেখে এইটুকো বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করতো ।

ক্যানভাসার এখনও আছে তবে যুগ পাল্টেছে। এখন তিনশ টাকার এনার্জি লাইটের একশ টাকার যুগ। ভাঙ্গা বাক্সে ক্যান্সারের ঔষধ নিয়ে ঘুরে বেড়ানো মানুষ গুলোর এখন জায়গা পাওয়াই কঠিন।কোম্পানী যখন রাস্তায় নেমে আসে তখন এই সব মানুষের কোটরে ঢোকা চোখে আর স্বপ্ন বলে কিছু অবশিষ্ট থাকে না। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় সেই সেদিনের মতো বুকে হাত বেধে দাড়িয়ে যাই কোন মহাঔষধের রুগ্ন দরিদ্র আবিস্কারকের ক্যানভাসে। মন দিয়ে শুনি মিথ্যা গল্প। তারপর আগ্রহ করে “বউকে বশে রাখার” দুই ফাইল গাছড়া নিয়ে বাড়ীর পথ ধরি। নাহ,বৌটাকে বশে রাখার জন্য না। জীবন যুদ্ধের পরাজিত ঐ মানুষটার একবেলার খাবার তুলে দেবার জন্য। আসলে সময় এমনই। কিছুই বদলায় না শুধু দেখার চোখ বদলায় ভাবার মন বদলায়।………চলবে……

Comments

comments